Logo
Notice :
Welcome To Our Website...
সাধারণ মানুষ শুধু ঠকছেন: ব্যাংকের নয়-ছয় সুদ

সাধারণ মানুষ শুধু ঠকছেন: ব্যাংকের নয়-ছয় সুদ

হারুন-অর-রশিদ ::: উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যয় কমাতে ব্যবসায়ীদের চাপে সরকারের নির্দেশে ব্যাংক খাতের সুদের হারে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে। নয়-ছয় সুদহার বাস্তবায়নের ফলে কেউ ব্যাংকে আমানত রাখলে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ পাবেন। ঋণ নিতে গেলে সুদ দিতে হবে সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ। আপামর সব মানুষের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ করা হলেও ব্যাংক থেকে ঋণসুবিধা পান শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নেওয়ার ফলে পুঁজি সংগ্রহ বাবদ ব্যয় কমে গিয়ে সামান্য হলেও পণ্যমূল্য কমার কথা।

কিন্তু কমেনি, উল্টো বেড়েছে। আবার ব্যাংকে টাকা জমা রেখে আগের তুলনায় অর্ধেক পাচ্ছেন আমানতকারীরা। অর্থাৎ সাধারণ আমানতকারী ব্যাংকে টাকা রেখে ঠকছেন, বাজারেও ঠকছেন। ব্যবসায়ীদের দাবি- সুদহার কমায় তাদের ব্যয় কিছুটা কমেছে। কিন্তু অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে। করোনার সংক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক না হলে সুদহার কমানোর সুফল সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাবে না।

সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ সুদহার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। ১ এপ্রিল থেকে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। ঋণের সুদহার সার্কুলার দিয়ে বেঁধে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সুদহার বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে আমানতের বিপরীতে সুদহার নির্ধারণ করে দিলেও প্রকাশ্যে কোনো সার্কুলার জারি করেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঘোষিত সুদ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের করা হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসে বেশিরভাগ ব্যাংক সঞ্চয়ী আমানতের সুদ দিচ্ছে ৫-৬ শতাংশের মতো। অন্যদিকে ঋণের বিপরীতে গড়ে ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ সুদ আদায় করছে ব্যাংকগুলো। কিন্তু গত স্বল্পসুদে ঋণ পেলেও এর কোনো সুফল দেখা যায়নি দেশের বাজারে। মানুষের প্রয়োজনীয় শিল্পজাত অধিকাংশ পণ্যের দাম বেড়েছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, এখন ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদহার ৬ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। আমানতের সুদহারের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে আমানতের সুদ কম হয়, তা হলে ব্যাংকে আমানত রাখা মানে টাকা কমে যাওয়া। এমন অবস্থা চলতে থাকলে মানুষ এখন ব্যাংকে আমানত রাখা তো কমিয়ে দিচ্ছে, আগামীতে আরও কমিয়ে দেবে। বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজবে তারা।

তিনি বলেন, পণ্যমূল্য কমাতে সুদহার সরাসরি প্রভাব ফেলে না। তবে উৎপাদনের ব্যয় কমিয়ে পণ্যমূল্য কমাতে পারে। কিন্তু করোনার কারণে উৎপাদন স্বাভাবিক না হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়ে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির কারণে চ্যাপ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ব্যয় সামলাতে না পেরে অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে আসছেন।

রাজধানীর মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা জসিমউদ্দিন। জমি বিক্রির ৩০ লাখ টাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করেন তিন বছর আগে। প্রতিমাসে ব্যাংক থেকে মুনাফা পেতেন প্রায় ২৬ হাজার টাকা। ওই টাকায় চলত সংসার। এখন আমানতের মুনাফার হার অনেক কমে গেছে। গত চার মাস ধরে ডিপোজিট থেকে জসিমউদ্দিন পাচ্ছেন মাত্র ১৪ হাজার টাকা। জীবনযাত্রাসহ সব ধরনের ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু আয় প্রায় অর্ধেক কমে গেছে। এখন বাড়তি খরচ মেটাতে বাড়তি আয়ের বিকল্প চিন্তা করছেন তিনি।

জসিমউদ্দিন বলেন, ব্যাংকের সুদ কম পাচ্ছি। বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে। এখন একদিকে সব কিছুর ব্যয় যেমন বেড়েছে, অন্যদিকে আয় কমে গেছে। অন্য কোনো আয়ের পথ নেই। কী করব? এখন সঞ্চয়পত্রে একটু বেশি লাভ পাওয়া যাবে। তবে কিছু কাগজপত্র লাগবে। তা সংগ্রহ করে এ মাসেই সঞ্চয়পত্র কিনব।

স্বল্প টাকার আমানতকারীরা আরও বেশি সমস্যায় আছেন। এদের সুদহার আরও কম ৩ থেকে ৫ শতাংশের মতো। বেসরকারি চাকরিজীবী আসাদুজ্জামান ২০১৫ সালে সঞ্চয় হিসাব খোলেন প্রতিমাসে জমানো অর্থ মেয়াদ শেষে সুদ-আসলে সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ টাকা। এখন ফিক্সড ডিপোজিটের জন্য কয়েকটি ব্যাংকে খোঁজ নিয়েছেন। সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ অফার করেছে কয়েকটি ব্যাংক। বেশিরভাগ ব্যাংকই ডিপোজিট রেট ৫ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশের কথা বলেছে। তিনি জানান, ৪ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখলে বিভিন্ন চার্জ কাটার পর মাসে সর্বোচ্চ পাবে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা। তা হলে ব্যাংকে টাকা রেখে লাভ কী?

এদিকে আমানতকারীরা ঠকলেও লাভ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। একদিকে তারা কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন, অন্যদিকে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে মুনাফা করছেন। বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৬ টাকা বেড়েছে। অথচ এপ্রিলের আগে ধান কেনার জন্য ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে গেলে ১৬ থেকে ২২ শতাংশ সুদ দিতে হতো। কর্মচারীদের বেতন বা অন্যান্য খরচ মেটাতে নেওয়া ঋণের সুদহার ছিল এটি।

কিন্তু এপ্রিলের পর থেকে তারা ঋণ পাচ্ছেন ৯ শতাংশ সুদে। তাদের ব্যবসার মূল পুঁজি সংগ্রহের খরচ কমেছে। অথচ চালের দাম বেড়ে গেছে। অন্য সব বাণিজ্যিক ঋণের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। পুঁজির খরচ কমেছে সব ধরনের উৎপাদনেও। কিন্তু সুদহার কমার ৫ মাসেও বাজারে কোনো পণ্যের দাম কমেনি, উল্টো বেড়েছে। জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংক ঋণের সুদ কমানোর সুফল দূরের কথা, ঠকছেন সাধারণ মানুষ। আর ব্যবসায়ীরা দুদিক থেকে লাভ গুনছেন।

ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, সুদহার কমার কারণে পণ্যমূল্য কমার কথা। কিন্তু করোনার কারণে ব্যবসার অন্যান্য খরচ বেড়েছে। সুদহার কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা কঠিন সময়ে সুবিধা পাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু উৎপাদন, পরিবহনসহ অন্যান্য ব্যয় করোনার কারণে বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যমূল্য কমানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা চাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে গ্রামসহ সারাদেশের প্রত্যেকটি মানুষ সুদহার কমার সুফল পাক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাধারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখে মুনাফার আশায়। অনেকের সংসার চলে এ মুনাফার টাকায়। এখন মুনাফার হার কমায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা। কারণ এখন বেশিরভাগ ব্যাংক মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম সুদ অফার করছে। মূল্যস্ফীতি বেশি কারণ বাজারের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। মূল্যস্ফীতির তুলনায় সুদহার কম হওয়ার অর্থ ব্যাংকে টাকা রাখলে বছর শেষে প্রকৃত আয় কমে যাবে। এতে সমস্যায় পড়বেন দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা।

সার্বিকভাবে নয়-ছয় সুদহারের প্রভাব বাজারে যেভাবে পড়ার কথা বলা হয়েছিল, সেটি হয়নি। সুদ কমিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিলে ব্যবসায়ীরা বাজারকে সুদহার কমানোর নিয়ামক হিসাব হাজির করেন। কিন্তু বাজারে সাধারণ মানুষকে সুবিধা দিতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি তারা। এমনকি সরকারও সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা নিলেও বাজার নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিচ্ছে না।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *