Logo
Notice :
Welcome To Our Website...
নেককার নারীর গুণাবলী

নেককার নারীর গুণাবলী

বাংলাদেশ ক্রাইম // কুরআনুল কারিমের অনেক আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা নেককার নারীর অনেক গুণ তুলে ধরেছেন। নিজেদের জীবনে এগুণগুলোর বাস্তবায়ন ঘটালে সে নারী হয়ে ওঠে নেককার। যা তাকে দুনিয়া ও পরকালে সম্মানের আসনে আসীন করেন। কুরআনে ঘোষিত নেককার নারী গুণগুলো তুলে ধরা হলো-

 

১) দ্বীনদারী ও সতী-সাধ্বী: নেককার নারী প্রথম গুণ হলো- দ্বীনদার ও সতী-সাধ্বী হওয়া। কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ তাআলা صَّالِحَاتُ তথা দ্বীনদার সতী-সাধ্বী গুণের অধিকারী হিসেবে নারীকে উল্লেখ করেন।

আয়াতে এ শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে জারীর তবারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, ‘দ্বীনের সঠিক অনুসারণকারীণী ও সৎকর্মশীল নারীগণ।’ নেককার নারীদের সম্পর্কে হাদিসে এসেছে- – হজরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘সোনা-রূপা সম্পর্কিত আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কোন ধরনের মাল সঞ্চয় করব? তিনি বললেন, তোমাদের প্রত্যেকেই যেন সঞ্চয় করে- কৃতজ্ঞ অন্তর, জিকিরকারী মুখ এবং পরকালীন কর্মকাণ্ডে সহায়তাকারিনী মুমিনা নারী।’ (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

– রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘দুনিয়া হলো ক্ষণিক উপভোগের বস্ত্ত। আর দুনিয়ার সর্বোত্তম সম্পদ (উপভোগের বস্ত্ত) সাধ্বী নারী।’ (মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ)

– হজরত আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো মুমিনের জন্য আল্লাহর ভয় অর্জনের পর নেককার স্ত্রীর চেয়ে কল্যাণকর কিছু নেই। কারণ স্বামী তাকে আদেশ করলে সে আনুগত্য করে, তার দিকে দৃষ্টিপাত করলে সে (স্বামী) মুগ্ধ হয়। তাকে নিয়ে শপথ করলে সে তা (শপথকৃত কর্ম) পূরণ করে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে নিজেকে (অন্যায়-অপকর্ম থেকে) এবং স্বামীর সম্পদ সংরক্ষণ করে।’ (ইবনে মাজাহ)

২) বিশ্বস্ত ও অনুগত হওয়া: নারীর দ্বিতীয় গুণ হলো- স্বামীর অনুগত ও বিশ্বস্ত হওয়া। কুরআনুল কারিমে কানিতাত শব্দ দিয়ে তা বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ও স্বামীর অনুগত নারীদের কানিতাত বলা হয়। হাদিসে এসেছে-

– হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নারী যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবে, রমজান মাসের রোজা রাখবে, নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে এবং স্বামীর আনুগত্য করবে তখন তাকে বলা হবে, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (মুসনাদে আহমাদ)

হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, নারীদের মধ্যে কোন নারী উত্তম। তিনি বললেন, স্বামী যাকে দেখলে আনন্দবোধ করে, যাকে আদেশ করলে আনুগত্য করে, স্ত্রীর বিষয়ে এবং সম্পদের ব্যাপারে স্বামী যা অপছন্দ করে তা থেকে বিরত থাকে।’ (মুসনাদে আহমাদ, নাসাঈ)

৩) সতীত্ব ও সম্পদের হেফাজত করা: নারীর তৃতীয় গুণ হলো- সতীত্ব ও সম্পদের হেফাজত করা। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা যেভাবে বলেছেন- حَافِظَاتٌ لِّلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللّهُ তথা নিজের সতীত্বের হেফাজত করা এবং স্বামীর (অনুপস্থিতিতে তার) ধন-সম্পদ হেফাজত করা। (সুরা নিসা : আয়াত ৩৪)

আয়াতের এই বাক্যের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে জারীর তবারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘নারীগণ তাদের স্বামীর অবর্তমানে নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করবে এবং এক্ষেত্রে কোনো ধরনের খেয়ানত করবে না। আর স্বামীর ধন-সম্পদ সংরক্ষণ করবে। তাদের উপর এ দায়িত্ব আল্লাহর পক্ষ থেকেই আরোপিত।’ হাদিসের এসেছে-

– হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘উত্তম স্ত্রী সে, যার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তোমাকে আনন্দিত করে, আদেশ করলে আনুগত্য করে, তুমি দূরে থাকলে তার নিজের ব্যাপারে এবং তোমার সম্পদের ব্যাপারে তোমার অধিকার রক্ষা করে। তারপর তিনি কুরআনের উক্ত আয়াত (পুরুষ নারীদের অভিভাবক) তেলাওয়াত করেন।’ (তাফরিরে তবারি)

৪) পবিত্র ও চরিত্রবান হওয়া: নারীর চতুর্থ গুণ হলো- নিজে পবিত্র তাকা এবং সৎচরিত্রবান হওয়া। কুরআনুল কারিমের অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন- وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ তথা পবিত্র নারীরা পবিত্র পুরুষদের উপযুক্ত আর পবিত্র পুরুষরা পবিত্র নারীদের উপযুক্ত। (সুরা নুর : আয়াত ২৬ )

এ আয়াতে মুমিন নর-নারীর জন্য মূলনীতি বলে দেয়া হয়েছে যে- আল্লাহ তাআলা মানবচরিত্রে স্বাভাবিকভাবে পরস্পরের মাঝে যোগসূত্র রেখেছেন। পবিত্র ও চরিত্রবান নারীদের আগ্রহ পবিত্র ও চরিত্রবান পুরুষদের প্রতি হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে পবিত্র ও চরিত্রবান পুরুষদের আগ্রহ পবিত্র ও চরিত্রবান নারীদের প্রতি হয়ে থাকে।

স্বাভাবিকভাবে প্রত্যেক চরিত্রবান নারী-পুরুষ নিজ নিজ আগ্রহ অনুযায়ী জীবনসঙ্গী খোঁজ করে নেয় এবং প্রাকৃতিক বিধান অনুযায়ী সেটাই বাস্তবরূপ লাভ করে। এ জন্য জীবনসঙ্গী ও সঙ্গিনী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলাম পবিত্র ও সৎচরিত্রকে প্রাধান্য দিতে জোর তাকিদ দিয়েছে। হাদিসে এসেছে-

– হজরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তিন গুণের যে কোনো একটি গুণের কারণে নারীকে বিয়ে করা যায়- ধন-সম্পদের কারণে, রূপ-সৌন্দর্যের কারণে ও দ্বীনদারির কারণে। তুমি দ্বীনদার ও চরিত্রবানকেই গ্রহণ কর।’ (ইবনে আবি শায়বা, মুসনাদে আহমাদ)

৫) নিষ্কুলুষ চরিত্রের অধিকারী হওয়া: নারীর পঞ্চম গুণ হলো- বিয়ের মাধ্যমে চারিত্রিক পবিত্রতা সম্পন্ন হওয়া নারীর অন্যতম গুণ। গোপনে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনে লিপ্ত না হয়ে নিষ্কুলুষ চরিত্রের অধিকারী হওয়া। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন- ‘তারা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চারিত্রিক পবিত্রতাসম্পন্ন হবে, ব্যভিচারিনী হবে না এবং গোপনে কোনো অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনকারিনী হবে না।’ (সুরা নিসা : আয়াত ২৫ )

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় হজরত ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, চারিত্রিক নিষ্কলুষতার অধিকারিনী নারীগণ, যারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ব্যভিচারিনী হবে না এবং সঙ্গোপনে অবৈধ বন্ধু গ্রহণকারিনী হবে না। তিনি বলেন, জাহেলি যুগের লোকেরা প্রকাশ্যে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়াকে হারাম মনে করত, কিন্তু গোপনে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়াকে হালাল মনে করত। এই প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা কুরআনের আয়াত নাজিল করলেন- তোমরা প্রকাশ্যে হোক, অপ্রকাশ্যে হোক কোনো রকম অশ্লীল কাজের কাছেও যেও না (সুরা আনআম : আয়াত ১৫১)।’ (তাফসিরে তবারি)

বর্তমান সমাজে অবৈধ সম্পর্কের ব্যাধি মহামারিতে পরিণত হয়েছে। পর্দাহীনতা, সহশিক্ষা এবং অশ্লীল ফিল্ম ও ছবির বদৌলতে একদিকে অবিবাহিত উঠতি নর-নারী তথাকথিত প্রেমের নামে ভয়ঙ্কররূপে প্রকাশ্য অশ্লীলতায় মেতে উঠছে, অন্যদিকে পরকীয়া প্রেমের কারণে ঘর ভাঙছে অসংখ্য নারীর। তাই মুসলমান নর-নারীরা যতক্ষণ আল্লাহর হুকুম ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলবে ততক্ষণ পারিবারিক শান্তি ও দাম্পত্য জীবনের সুখ খুঁজে পাবে না।

৬) সরলমনা হওয়া: নারীর ষষ্ঠ গুণ হলো- দ্বীনদার ও চরিত্রবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরল মনের অধিকারিণী হওয়া। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন- ‘চরিত্রবান, সরলমতী ঈমানদার নারীরা।’ (সুরা নুর : আয়াত ২৩)

এই আয়াতাংশের ব্যাখ্যায় আল্লামা আলুসি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, পবিত্রতার সার্বিক উপাদান নিয়ে বেড়ে উঠা এবং উত্তম চরিত্রের উপর লালিত-পালিত হওয়ার কারণে অন্য কোনো চিন্তা ও মানসিকতা যাদের কল্পনায়ও আসে না। এই গুণ পূর্ণ নিষ্কলুষতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার প্রমাণ বহন করে, যা শুধু মুহাসানাত (সতী নারী) শব্দের মধ্যে পাওয়া যায় না।’ (রূহুল মাআনি)

তাছাড়া আত্মার ব্যাধিমুক্ত, স্বচ্ছ অন্তরের নারীরা, যাদের মধ্যে প্রবঞ্চনামূলক চাতুর্য নেই। যাদের স্বভাব-প্রকৃতিতে অসৎ কোনো মনোবাসনা নেই। শৈশবকাল থেকেই এই স্বভাব-সুচরিত্র গড়ে উঠতে সহায়ক হয়।।

সরলমনা বৈশিষ্ট্যের নারীদের বাইরের জগত সম্পর্কে ধারণা থাকে না, অবৈধ সম্পর্কের কল্পনাও তাদের অন্তরে থাকে না। তারা প্রবঞ্চনা কি জিনিস তা বুঝে না। ছল-ছাতুরিও জানে না। প্রতারণা ও মিথ্যা বলে না। পর্দাহীনতা ও ফ্যাশন সম্পর্কে চিন্তাও করে না। ফলে তাদের চরিত্র কলুষিত হওয়া ও দ্বীনদারী বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে না।

৭) ঘরে অবস্থানকারী নারী: নারীর সপ্তম গুণ হলো- ঘরে অবস্থান করা। বিনা প্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া। যেমনটি ঘোষণা করেছেন মহান আল্লাহ- ‘তোমরা নিজ নিজ ঘরে অবস্থান কর। (পর পুরুষকে) সাজসজ্জা প্রদর্শন করে বেড়িও না। যেমন প্রাচীন জাহেলি যুগে প্রদর্শন করা হত।’ (সুরা আহজাব : আয়াত ৩৩)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবনে কাসিরে এসেছে- তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থানকে অবধারিত করে নাও। প্রয়োজন ব্যতিত ঘর থেকে বের হবে না।’

আয়াতের নীতিমালা হচ্ছে, নারীর আসল কাজ তার ঘরে অবস্থান করা। ঘরোয়া কর্তব্য পালন করা এবং সন্তান-সন্তুতিকে গড়ে তোলাই তার মূল দায়িত্ব। তবে এর অর্থ এমন নয় যে- নারীর জন্য ঘর থেকে বের হওয়া একেবারেই নাজেয়েজ। বরং প্রয়োজনে সে পর্দার সঙ্গে বাইরে যেতে পারবে। বাইরে যাওয়া এবং অবস্থান করাও হবে প্রয়োজন অনুসারে। হাদিসে এসেছে-

হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, নারীরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আগমন করে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! পুরুষরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ও অন্যান্য মর্যাদায় অগ্রগামী হয়েছেন। আমাদের জন্য কি এমন কোনো আমল রয়েছে যার মাধ্যমে মুজাহিদীনের সমপর্যায়ের মর্যাদা ও সওয়াবের অধিকারী হতে পারব? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের থেকে যারা নিজ ঘরে অবস্থান করবে সেটাই তাদেরকে মুজাহিদদের ফজিলত ও সাওয়াবে উপনীত করবে।’ (মুসনাদে বাজজার, তাফসিরে ইবনে কাসির)

– হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, নারী হল আবরণীয়। যখন সে বের হয় তখন শয়তান তার অনুসরণ করে। যখন সে ঘরে আবদ্ধ থাকে তখন আল্লাহর রহমত লাভের অতি কাছাকাছি থাকে।’ (মুসনাদে বাজজার)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সব নারীকে কুরআনে উল্লেখিত গুণের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *