Logo
Notice :
Welcome To Our Website...
সিআইডির তদন্তে দায়ী তিতাসের ৮ কর্মী

সিআইডির তদন্তে দায়ী তিতাসের ৮ কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক // নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা এলাকার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণের মামলায় মসজিদ কমিটির সভাপতিসহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। প্রায় তিন মাস তদন্ত শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের আদালতে এ চার্জশিট দাখিল করা হয়।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার নাসিরউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আরও আটজনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করার প্রস্তুতি চলছে। তারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়ায় প্রয়োজনীয় অনুমতি সাপেক্ষে চার্জশিট দাখিল করা হবে।’

সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিআইডি জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ঘটনার আগে প্রায় তিন মাস ধরে তিতাসের পাইপলাইনের ছিদ্র থেকে গ্যাস বেরিয়ে মসজিদের ভেতরে জমা হচ্ছিল। গ্যাসের গন্ধ তীব্র হয়ে ওঠায় সাত-আট দিন আগে নামাজ পড়তে যাওয়া লোকজন বিষয়টি মসজিদ কমিটিকে জানিয়েছিল। কিন্তু মসজিদ কমিটি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সঠিকভাবে মসজিদ পরিচলনায় কমিটির অবহেলা, অব্যবস্থাপনা, উদাসীনতা, সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ না করা, কারিগরি দিক বিবেচনা না করে অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া, গ্যাসের উপস্থিতি জানার পরও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা না নেওয়া, মসজিদের ভেতরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি স্থাপন, তিতাসের কর্মীদের দায়িত্বে অবহেলা, গ্যাসলাইন তদারকি না করা, পাইপের ছিদ্র মেরামত না করা, ঝুঁকিপূর্ণভাবে গ্যাসলাইন স্থানান্তরের কারণে ওই ভয়াবহ অগ্নিকা- ও প্রাণহানি ঘটে বলে সিআইডির তদন্তে সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে।’ যে ২৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন- আবদুল গফুর মিয়া (৬০), শামসুদ্দিন সর্দার (৬০),

সামসু সরদার (৫৭), শওকত আলী (৫০), অসীমউদ্দিন (৫০), জাহাঙ্গীর আলম (৪০), শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল (৪৫), নাঈম সরদার (২৭), তানভির আহমেদ (৪৫), আল-আমিন (৩৫), আলমগীর সিকদার (৩৫), মাওলানা আল আমিন (৪৫), সিরাজ হাওলাদার (৫৫), নেওয়াজ মিয়া (৫৫), নাজির হোসেন (৫৬) আবুল কাশেম (৪৫), আবদুল মালেক (৫৫), মো. মনিরুল (৫৫), স্বপন মিয়া (৩৮) আসলাম আলী (৪২), আলী আজম (মিল্কি) (৫৫), মো. কাইয়ুম (৩৮), মামুন মিয়া (৩৮), দেলোয়ার হোসেন, বশির আহমেদ হৃদয় (২৮), মোহাম্মদ রিয়েল (৩২), আরিফুর রহমান (৩০), মোবারক হোসেন (৪০) এবং রায়হানুল ইসলাম (৩৬)।

বাকি যে আটজনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার জন্য সিআইডি সরকারের অনুমতি চেয়েছে, তারা হলেন- মো. সিরাজুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান রাব্বি, মানিক মিয়া, এসএম হাসান শাহরিয়ার, মো. মনিবুর রহমান চৌধুরী, মো. আইয়ুব আলী, মো. ইসমাইল প্রধান এবং মো. হানিফ মিয়া। তারা সবাই তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তা-কর্মচারী। ঘটনার পর তিতাস কর্তৃপক্ষ ওই ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে। পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে তাদের দায় দায়িত্ব নিরূপণে ২টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দুই কমিটিই তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলেছে, অগ্নিকা-ের জন্য দায়ী নয় তিতাসের সেই ৮ কর্মকর্তা-কর্মচারী। তারা নির্দোষ। ফলে তাদের সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে কাজে যোগদানেরও অনুমোদন দেয় তিতাস কর্তৃপক্ষ। এর পর গত ৫ অক্টোবর থেকে তিতাসের ওই আট কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজে যোগ দেন।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার নাসিরউদ্দিন আহমেদ জানান, অভিযোগপত্রের ২৯ জনের মধ্যে চারজন এবং পরের ৮ জনের সবাই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। গ্রেপ্তার ১২ জনের সবাই এখন জামিনে আছেন।

গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে এশার নামাজ চলাকালে নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লার ওই মসজিদে হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। সে সময় নামাজে যাওয়া ৩৭ জনের পাশাপাশি বাইরে থাকা একজন পথচারী ওই ঘটনায় দগ্ধ হন। তাদের মধ্যে ৩৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পেরেছেন কেবল চারজন।

সেই রাতে প্রাথমিকভাবে মসজিদের ছয়টি এসি একসঙ্গে বিস্ফোরিত হওয়ার কথা বলা হলেও পরে গ্যাস জমে দুর্ঘটনা ঘটার কথা বলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।

ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ পরদিন তিতাস, ডিপিডিসি, মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে ‘অবহেলাজনিত মুত্যু সংঘটনের’ অভিযোগ এনে মামলা করে, যার তদন্তভার পরে সিআইডির হাতে যায়।

বিস্ফোরণের কারণ খতিয়ে দেখতে পাঁচটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন, তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, সিটি করপোরেশন। সেই তদন্তে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে থাকে অনিয়ম ও গাফিলতির নানা তথ্য।

তিতাসের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৭ সালে স্থাপন করা একটি লাইনের বদলে ১৯৯৮ সালে নতুন লাইনের সংযোগ পান কয়েকজন গ্রাহক। গ্রাহকের বাড়ির সামনে থেকে পুরনো সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও তখন সড়কের মূল লাইন থেকে তা বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। পরে পরিত্যক্ত ওই লাইনের ওপর নির্মাণ করা হয় মসজিদ।

মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা গ্যাস রাইজার এবং মসজিদ নির্মাণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত পুরনো বিতরণ লাইন থেকে গ্যাস বের হচ্ছিল। সেই গ্যাস মসজিদের বেইজমেন্ট ভেদ করে ভেতরে গিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে জমা হয়।

মসজিদে একাধিক বিদ্যুৎ সংযোগের মধ্যে একটি সংযোগ ছিল অবৈধ। সেই রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর মুয়াজ্জিন যখন এক ফেজ থেকে আরেক ফেজে লাইন ‘চেইঞ্জওভার’ করেন, তখন ‘স্পার্ক’ থেকে মসজিদের নিচতলায় জমা গ্যাসে আগুন ধরে যায়।

মসজিদের পাশের সড়কের মাটি খুঁড়ে পরিত্যক্ত পাইপলাইনে ছয়টি ছিদ্র পাওয়ার পর সেগুলো বন্ধ করে তিতাস কর্তৃপক্ষ। তিতাসের ফতুল্লা জোনের চার কর্মকর্তাসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি, পরে তাদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এ ছাড়া ডিপিডিসির একজন মিটার রিডার এবং দুই ইলেক্ট্রিশিয়ানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। ইলেক্ট্রিশিয়ান মোবারক ও রায়হান আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ওই মসজিদে অবৈধ সংযোগ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন।

তদন্তে মসজিদের পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার তথ্য পাওয়ার পর কমিটির সভাপতি আবদুল গফুর মিয়াকেও গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *