Logo
Notice :
Welcome To Our Website...
ডান্ডির নেশায় বিপথগামী হচ্ছে শিশু-কিশোররা

ডান্ডির নেশায় বিপথগামী হচ্ছে শিশু-কিশোররা

বাংলাদেশ ক্রাইম // রাব্বি ও সাইজুর বয়স এখনো ১০ বছর পেরোয়নি। তাদের গায়ে জড়ানো রঙিন শীতের কাপড়ে ধুলার স্তর পড়ে কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সপ্তাহখানেক গোসল করেনি। গত বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের রাস্তায় বসে খোশগল্পে মশগুল ছিল তারা। প্রতিবেদক কাছে আসতেই হতচকিত হয়ে কথা বন্ধ করলেও হাতে থাকা গাঁজার স্টিক (সিগারেটের ভেতর ঠাসা গাঁজা) লুকাতে পারেনি রাব্বি। হাত বদল করে সেই স্টিক টানছিল সাইজুও।

অদূরেই দেখা মিলল কিশোর ফরিদের। সে ধীর গতিতে এলোমেলো পদক্ষেপে হাঁটছে, আর মুঠোয় থাকা পলিথিনের পোঁটলাটি বারবার নাক ও মুখে চেপে ধরে জোরে জোরে শ্বাস টানছে। পোঁটলার ভেতরে হলুদ রঙের জিনিসটি কী, জানতে চাইলে ফরিদের সরল উত্তর- ডান্ডি। (চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ‘গ্লু-স্নিফিং’ বা ‘গ্লু-গাম শুকা’। ডান্ডি এক ধরনের গ্লু-গাম বা আঠা জাতীয় উদ্বায়ী পদার্থ যা সাধারণ তাপমাত্রায় সহজেই বাষ্পে বা ধূম্রে পরিণত হয়)। কেন, জানেন না পাল্টা প্রশ্ন তার? এটা টানলে কী হয়? এবারও রাখঢাক না রেখেই ফরিদ জানায়, পিনিক! মনে হয় উড়তাছি স্যার।

ডান্ডির কত দাম, কোথায় পাওয়া যায় জানতে চাইলে ফরিদ বলে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন হার্ডওয়্যার দোকান ও জুতার কারখানা থেইক্যা কিনি। ছোট্ট এক ডিব্বার দাম ৫৫ থেইক্যা ৭০ ট্যাকা। তয় মোড়ামুড়ি করে। দিতে চায় না। ট্যাকা বাড়ায় দিলে আবার ঠিকই দেয়।

ফরিদকে ছেড়ে পার্কের ভেতরে একটু এগোতেই চোখে পড়ল হাঁটতে হাঁটতে ডান্ডির পোঁটলা থেকে ৬ বছরের শিশু কাদের ও ১৪ বছরের কিশোরী আসমার ঊর্ধ্ব শ্বাসে স্বাদ গ্রহণের দৃশ্য। এদের মধ্যে কাদের রাখঢাক না রাখলেও সচেতন আসমা অবশ্য ওড়নার নিচে নিয়ে আড়াল করে টানছিল ডান্ডি। বাহাদুর শাহ পার্কে এর পর আধা ঘণ্টা ঘুরে আরও ১২ শিশু-কিশোর-কিশোরীকে ডান্ডি টানতে দেখা গেছে।

শুধু এরাই নয়, প্রতিনিয়ত তাদের মতো মরণঘাতী ডান্ডির গ্রাসের শিকার হচ্ছে যুবক এমনকি বৃদ্ধরাও। যাদের প্রায় সবাই থাকেন ফুটপাত, বস্তি ও পার্কে। কেবল পুরান ঢাকাই নয়, রাজধানীর অধিকাংশ থানা এলাকায় তাদের বিচরণ। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, কমলাপুর, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, তেজগাঁও রেললাইন এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন বস্তিতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে ডান্ডির আগ্রাসন। দিন-রাত নেশায় বুঁদ হয়ে এসব পথশিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ ছাড়াও বড় বড় অপরাধে। বিষয়টি ভাবনায় ফেলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের।

এমন প্রেক্ষাপটে নেশাগ্রস্ত শিশু-কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম পুলিশের রমনা, লালবাগ, ওয়ারী, মতিঝিল, তেজগাঁও, মিরপুর, গুলশান, উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনারদের (ডিসি) প্রতি ৮ নির্দেশনা জারি করেছেন। গত ৫ জানুয়ারি ডিএমপি সদরদপ্তর থেকে পাঠানো কমিশনারের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই আদেশ প্রতিপালিত হচ্ছে না অধিকাংশ থানা এলাকায়।

ডিএমপি কমিশনার চিঠিতে উল্লেখ করেন, ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এক শ্রেণির শিশু কিশোর; যাদের অধিকাংশই ছিন্নমূল ডান্ডি নামক এক ধরনের নেশায় আসক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং দলবদ্ধ হয়ে ডান্ডি গ্রহণ করে আসছে। এভাবে নেশায় আসক্ত হয়ে তারা চুরি, ছিনতাইজাতীয় অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় আপনার অধিক্ষেত্র এলাকায় এ জাতীয় নেশায় আসক্ত শিশু কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনার জন্য নিম্নবর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

নির্দেশগুলো হলো- নেশাগ্রস্ত শিশু-কিশোরদের ছবিসহ তালিকা প্রস্তুত করা; তাদের নিয়মিত কাউন্সেলিং করা; ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা; পুনর্বাসনের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা; নেশার উৎস বা দ্রব্য (রঙ, আঠা, সলিউশন ইত্যাদি) বিক্রয়কারী ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা এবং এসব দ্রব্য শিশু-কিশোরদের কাছে বিক্রি না করার নির্দেশনা দেওয়া; এ নির্দেশনা অমান্যকারী ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা; নেশাগ্রস্ত শিশুদের কোনো কাজে নিয়োগ না দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করা; সংশ্লিষ্ট বিট অফিসারদের স্ব স্ব বিটে এ ধরনের নেশা গ্রহণ বন্ধ করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া এবং ব্যর্থতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে হালনাগাদ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য চিঠিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সংক্রান্তে জোনাল সহকারী পুলিশ কমিশনার ও থানার অফিসার ইনচার্জদের সফলতা বা ব্যর্থতা তার পারফরমেন্স মূল্যায়নে প্রতিফলিত হবে বলেও পুলিশ কমিশনারের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস্) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, ডান্ডি নেশায় আসক্ত শিশু-কিশোরদের সুপথে ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করছে। ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে এ ব্যাপারে তদারকি করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ডান্ডি একটি অপ্রচলিত নেশা। এ নেশায় আক্রান্তদের বেশিরভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দরিদ্র। তাই শাস্তি দিয়ে এদের দমন করা মুশকিল। টেকসই সমাধান হলো- পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা। এজন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এগিয়ে এলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মেডিসিন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. কফিল উদ্দিন চৌধুরী আমাদের সময়কে জানান, ডান্ডি এক প্রকার গ্লু-গাম বা আঠাজাতীয় উদ্বায়ী পদার্থ যা সাধারণ তাপমাত্রায় সহজেই বাষ্পে বা ধূম্রে পরিণত হয়। সাধারণত চার ধরনের জৈব যৌগ যথা- টলুইন, বেনজিন, অ্যাসিটোন ও কার্বন ট্রাই ক্লোরাইড এ গামজাতীয় পদার্থে থাকে।

বিভিন্ন ধরনের রাবার ও চামড়াজাতীয় পদার্থ যেমন- জুতা, চাকার রাবার-টিউব প্রভৃতি মেরামতে সংযোজক হিসেবে এর বহুল ব্যবহার রয়েছে। এ ধরনের উদ্বায়ী গামজাতীয় পদার্থ বাষ্প বা ধূম্রাকারে গন্ধ শুঁকা বা শ্বাস গ্রহণের মাধ্যমে শ্বসনতন্ত্র হয়ে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে। প্রথমে জাগায় আনন্দের শিহরণ আর অনিয়ন্ত্রিত উন্মাদনার সৃষ্টি করে। পরে তা দেহে আনে এক শিথিলতার ভাব। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এ পদার্থের প্রতি সৃষ্টি হয় ব্যাপক আসক্তি।

তিনি আরও বলেন, এ নেশার প্রকোপতা সম্পর্কে আমাদের দেশে এখনো সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। যদিও দুই দশক ধরে এ ধরনের নেশায় আসক্তদের সংখ্যা আমাদের দেশে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সাধারণত বড় বড় শহরের বা সমাজের সুবিধাবঞ্চিত কিশোর-কিশোরী ও সদ্য বয়োপ্রাপ্তদের মধ্যে যেমন- রাস্তার টোকাই, ভবঘুরে, কুলি-মজুর শ্রেণির মধ্যে এ ধরনের নেশা যেন দিন থেকে দিন এক সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। সাধারণত সহজ প্রাপ্যতা, সহজলভ্যতা ও আইনত নিষিদ্ধ পদার্থ হিসেবে স্বীকৃত না হওয়ায় এ ধরনের নেশার প্রকোপ যেন এক মহামারী রূপ নিয়েছে। এ নেশার কালো থাবা যেন আজ সমাজের নিম্ন শ্রেণি হয়ে মধ্যবিত্ত সমাজে বিস্তার লাভ করতে শুরু করেছে। হার্ডওয়ারের দোকানগুলোয় এ ধরনের নেশা তথা গ্লু-গাম সহজলভ্য।

ডা. কফিলউদ্দিন জানান, এ নেশার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কিশোর-কিশোরী ও সদ্য বয়োপ্রাপ্ত শ্রেণি; অন্য ধরনের নেশায় আসক্ত ব্যক্তিরা; শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার অল্প বয়স্ক জনগোষ্ঠী; আচরণগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু; অতি চঞ্চল ও অমনোযোগী শিশু; হতাশা, উদ্বিগ্নতা, অত্যধিক মানসিক চাপে থাকা জনগোষ্ঠী; এ ধরনের নেশার প্রতি কৌতূহল প্রবণ কিশোর-কিশোরী; অসৎ সঙ্গ, তীব্র শারীরিক ও মানসিক আঘাত পরবর্তী মানসিক চাপ ও অ্যান্টি সোস্যাল পারসোনালিটি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা।

ডান্ডির ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের নেশায় আসক্তরা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে নানা মনো-আচরণগত, শারীরিক ও সামাজিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। এ ছাড়া মানব শরীরের শ্বসন, পরিপাক, স্নায়ু ও রক্ত সংবহনতন্ত্রের ওপর এ ধরনের নেশার ক্ষতিকারক উপাদানগুলো নানা বিরূপ প্রভাব ফেলে। যেমন, স্বল্পমেয়াদে- কলহ প্রবণতা, উত্তেজনা তথা উন্মত্ততা, উদাসীনতা, বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাওয়া, চিত্তবিভ্রম, শ্রুতি ও দৃষ্টি বিভ্রম, ক্ষুধামন্দা, বমি বা বমি ভাব, রক্ত বমি অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। দীর্ঘমেয়াদে- হতাশা, উদ্বিগ্নতা, মনোবৈকল্য, স্মৃতিভ্রম, আত্মহত্যা ইত্যাদি। এমনকি নেশার অতিমাত্রায় শ্বসন ও হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে বা শ্বাসরোধ বা দুর্ঘটনার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যুও হতে পারে। যক্ষ্মা, এইডস, যৌনবাহিত নানা রোগ, অ্যাজমা, ব্রংকাইটিস, সাইনোসাইটিস, লিভার সিরোসিস, লিভার ও ফুসফুসে ক্যানসার ইত্যাদি হতে পারে ডান্ডি সেবনে। তা ছাড়া সমাজে মাদক কারবার, চোরাচালান, চুরি, ডাকাতি, খুনসহ নানা ধরনের অপরাধের প্রকোপ বেড়ে যেতে পারে।

ডান্ডির বিস্তার প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে এ মেডিসিন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, সবার আগে প্রয়োজন এ ধরনের নেশা ও নেশার সমস্যা সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরি। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করতে পারে।

Print Friendly, PDF & Email

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *